এনাল স্টেনোসিস (Anal stenosis) হলো এমন একটি সমস্যা, যেখানে মলদ্বারের স্বাভাবিক পথটি সরু হয়ে যায়। ফলে মল সহজে বের হতে পারে না এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হয়।
এটি সাধারণ কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে আলাদা। কোষ্ঠকাঠিন্যে মল শক্ত হয়ে যায় বা মলত্যাগের গতি কমে যায়; কিন্তু এনাল স্টেনোসিসে মল বের হওয়ার পথটিই সংকুচিত হয়ে যায়।
*কেন হয়?
এনাল স্টেনোসিসের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। সবচেয়ে পরিচিত কারণগুলোর একটি হলো অর্শ বা পাইলসের অপারেশনের পর মলদ্বারে অতিরিক্ত দাগ বা শক্ত টিস্যু (scar tissue) তৈরি হওয়া।
এছাড়াও হতে পারে—
– দীর্ঘদিনের এনাল ফিশার
– মলদ্বারের অন্যান্য অপারেশন
– বারবার মলদ্বারে আঘাত বা অস্ত্রোপচার
– রেডিওথেরাপির পর
– কিছু প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ
– বিরল ক্ষেত্রে মলদ্বার বা রেকটামের টিউমার
* কী কী লক্ষণ দেখা যায়?
প্রধান লক্ষণ হলো মলত্যাগে অসুবিধা। যেমন—
– মলত্যাগের সময় অনেক বেশি চাপ দিতে হয়
– মল খুব সরু হয়ে বের হতে পারে
– মলত্যাগ করতে অনেক সময় লাগে
– মলত্যাগের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হয়
– মলত্যাগের পরও মনে হয় পেট পরিষ্কার হয়নি
– মলদ্বার দিয়ে রক্ত যেতে পারে
– বারবার কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে
– গুরুতর অবস্থায় মল আটকে যেতে পারে
অনেক রোগী বলেন, “মলত্যাগের বেগ আছে, কিন্তু মল বের হতে চায় না।” এটিও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
পাইলসের অপারেশনের পর কেন হতে পারে?
পাইলসের অপারেশনের সময় মলদ্বারের ভেতরের অতিরিক্ত টিস্যু অপসারণ করা হলে সাধারণত ক্ষতটি পরে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষত শুকানোর সময় অতিরিক্ত দাগ ও শক্ত টিস্যু (fibrosis) তৈরি হয়।
এর ফলে মলদ্বারের পথ ধীরে ধীরে সরু হয়ে যেতে পারে।
তবে পাইলসের অপারেশন করলেই এনাল স্টেনোসিস হবে—এমন নয়। এটি তুলনামূলকভাবে বিরল জটিলতা।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
সাধারণত একজন কোলোরেক্টাল সার্জন বা অভিজ্ঞ জেনারেল সার্জন রোগীর ইতিহাস ও মলদ্বার পরীক্ষা করেই অনেকটা ধারণা করতে পারেন।
প্রয়োজনে করা হতে পারে—
– মলদ্বার সরাসরি পরীক্ষা
– Digital rectal examination
– Anoscopy বা proctoscopy
– Colonoscopy
– সন্দেহ থাকলে biopsy
বিশেষ করে নতুন করে মল সরু হয়ে গেলে, রক্তপাত হলে বা ওজন কমে গেলে অন্য কোনো রোগ, বিশেষ করে টিউমার, আছে কি না তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসা কী?
চিকিৎসা নির্ভর করে মলদ্বার কতটা সরু হয়েছে এবং রোগীর সমস্যা কতটা গুরুতর তার ওপর।
*হালকা ক্ষেত্রে
অনেক সময় প্রথমে—
– বেশি আঁশযুক্ত খাবার
– পর্যাপ্ত পানি পান
– কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ
– প্রয়োজন অনুযায়ী মল নরম রাখার ওষুধ
দেওয়া হয়।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ধীরে ধীরে anal dilatation করা যেতে পারে।
*মাঝারি বা গুরুতর ক্ষেত্রে
যদি মলদ্বার অনেক বেশি সরু হয়ে যায় এবং ওষুধ বা অন্যান্য চিকিৎসায় ভালো না হয়, তাহলে অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে।
অপারেশনের মাধ্যমে শক্ত দাগের টিস্যু সরিয়ে বা কেটে মলদ্বারের পথ প্রশস্ত করা হয়। প্রয়োজন হলে শরীরের কাছাকাছি সুস্থ টিস্যু ব্যবহার করে anoplasty করা হয়।
সঠিক রোগীর ক্ষেত্রে এ ধরনের অপারেশনে মলত্যাগের সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
নিজে থেকে ডাইলেশন করা কি নিরাপদ?
না।
নিজে থেকে কোনো বস্তু দিয়ে মলদ্বার প্রশস্ত করার চেষ্টা করা বিপজ্জনক হতে পারে। এতে—
– ক্ষত হতে পারে
– রক্তপাত হতে পারে
– সংক্রমণ হতে পারে
– মলদ্বারের পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
– উল্টো আরও দাগ তৈরি হয়ে সমস্যা বাড়তে পারে
তাই dilatation প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী করা উচিত।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের কোনো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
– মল ক্রমশ সরু হয়ে যাচ্ছে
– মলত্যাগ করতে ক্রমাগত বেশি চাপ দিতে হচ্ছে
– মলদ্বারে তীব্র ব্যথা হচ্ছে
– বারবার রক্তপাত হচ্ছে
– মল একেবারেই বের হচ্ছে না
– পেটে প্রচণ্ড ব্যথা বা পেট ফুলে যাচ্ছে
– অকারণে ওজন কমছে
– আগের পাইলসের অপারেশনের পর নতুন করে এসব সমস্যা শুরু হয়েছে
* মনে রাখবেন
সরু মল হলেই যে এনাল স্টেনোসিস হয়েছে, তা নয়। বিভিন্ন কারণে মল সরু হতে পারে। আবার দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্যকেও অনেক সময় রোগীরা এনাল স্টেনোসিস মনে করেন।
সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরীক্ষা প্রয়োজন।
আশার কথা
এনাল স্টেনোসিসের কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। রোগটি কতটা গুরুতর এবং কেন হয়েছে তা নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ রোগীর মলত্যাগের সমস্যা অনেকটাই ভালো করা সম্ভব।
লজ্জা না করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মলত্যাগের দীর্ঘদিনের সমস্যা ফেলে রাখা উচিত নয়।